বুকরিভিউ (5)

অনলাইনে পড়াশোনাঃ কিছু মৌলিক কথা

প্রযুক্তির উৎকর্ষের মধ্য দিয়ে মানুষের পড়াশুনার গতি-প্রকৃতিতে নানাবিধ পরিবর্তন এসে হানা দিয়েছে। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। শতাব্দীকাল ধরেই সময়ের স্রোত বেয়ে শিক্ষার মতিগতিতে সবসময়ই কিছু না কিছু পরিবর্তন এসেছে। কিছু সংযোজন, বিয়োজন ও পরিমার্জন হয়েছে। বিগত দশকের শেষ ভাগে করোনার আগমনের মধ্য দিয়ে পুরো পৃথিবীতে অনলাইন শিক্ষা বেশ পরিচিত ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ইলম শিক্ষার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়েছে। এই বিষয়ে কিছু মৌলিক কথা তুলে ধরার চেষ্টা করছি পাঠকের সমীপে। 

অফলাইনে পড়া অনলাইন থেকে উত্তম

সাধারণ অবস্থায় সরাসরি উস্তাযের কাছে পড়াশোনা সবমসময়ই অগ্রগণ্য ও শ্রেষ্ঠ। এটি একটি দিবালোকের ন্যায় বাস্তবতা, যা অস্বীকারের বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। সরাসরি কারো কাছে পড়লে কলবে এর যে প্রভাব পড়ে থাকে, তা অনলাইনে ওই মাত্রায় হয় না। আরবীতে একটি প্রবাদ আছে, লাইসাল খবারু কাল মুআয়ানাহ। অর্থাৎ, দেখা জিনিস কখনোই শোনা জিনিসের মত নয়। দুইয়ের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ আছে। সেজন্য অফলাইনে পড়ার পর্যাপ্ত সুযোগ থাকলে অফলাইনেই সরাসরি পড়া উচিত। তবে যাদের সেই সুযোগ নেই তারা অনলাইনে পড়ার সুযোগটা গ্রহণ করে নিতে পারেন। 

প্রসঙ্গত এখানে একটা নীতির কথা বলে রাখি। এটি জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও কাজে লাগবে আশা করছি। এটিও মূলত একটি আরবী প্রবাদ থেকে গৃহীত−মা লা ইউদরাকু কুল্লুহু, লা য়ুতরাকু কুল্লুহু। অর্থাৎ, যার সবটা নেওয়া যাচ্ছে না, তার পুরোটাই ছেড়ে দেওয়াও উচিত নয়। বরং যতটুকু পারা যায়, ততটুকুই গ্রহণ করে নেওয়া। বাংলাতে এর কাছাকাছি প্রবাদ হলো, নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভাল। অনলাইন-অফলাইন কোথাও কোন কিছু না শেখা হলো নাই মামা, আর শুধু অনলাইনে শেখা কানা মামা। অফলাইনে সরাসরি উস্তাযের সামনে হাঁট গেড়ে বসা হলো ভাল মামা।

অনলাইনে পড়াশোনা দুটি ধরণ

অনলাইনে পড়াশোনার দু’টি ধরণ আছে। প্রথম হলো, নিজের মত যা খুশি ও যেভাবে খুশি সেভাবে অধ্যয়ন করা। বিভিন্ন বিক্ষিপ্ত টিউটোরিয়াল দেখে নিজের মতো কিছু শেখা বা বুঝে নেওয়া। ইলম চর্চার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি ঝুঁকিপূর্ণ।

দ্বিতীয় হলো, কোন যোগ্য উস্তাযের তত্বাবধানে থেকে তার দিকনির্দেশনা মেনে পড়াশোনা করা। এই পদ্ধতি প্রথম ধরনের মত ঝুঁকিপূর্ণ  নয়। এর মানও খারাপ নয়। বরং এভাবে মনোযোগ দিয়ে পড়লে একজন ছাত্র অফলাইনে সরাসরি যারা পড়েছে, তাদের অনেকের থেকেও ক্ষেত্রবিশেষ ভাল যোগ্যতাসম্পন্ন হয়। এটি আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। আমি  যাদেরকে এসো আরবি শিখি পুরোটা পড়িয়ে শেষ করেছি, তাদের মধ্যে অনেকে এমন আছে আলহামদুলিল্লাহ। 

অনলাইনে দারসের সাথে অফলাইনের মাদরাসাগুলোর কিছু চিত্রের সাথে মিলে যায়। দু’য়ের মধ্যে খুব বেশি ব্যবধান থাকে না। যেমন, কিছু মাদরাসায় ছেলেদের সামনে উস্তায সরাসরি বসে পড়ান আর মেয়েদের ওখানে শুধু স্পিকার সেট করা থাকে। তারা শুনে শুনে সবক ধরে। অনেক মহিলা মাদরাসায় উস্তাযের বসার জায়গা আর মেয়েদের দরসগাহ থাকে আলাদা। স্পিকারের মাধ্যমে তার আওয়াজটুকু শুধু তাদের কাছে পৌঁছে এবং এভাবেই তারা সবক ধরে। কেউ কাউকে দেখে না। অনেক ছোট রুমের ক্লাসে ছাত্র সংখ্যা বেশি হলে কিছু ছাত্র বসে এক রুমে, যেখানে উস্তায তাদের সামনে থাকে আর কিছু ছাত্র বসে অন্যরুমে, যেখান থেকে উস্তাযকে তারা দেখে না; শুধু কথাটুকু শুনে। এরকম খুঁজলে আরো কিছু চিত্র পাওয়া যাবে। এই চিত্রগুলোর সাথে অনলাইনের দারসের খুব বেশি একটা পার্থক্য নেই।

উস্তায নির্ধারণে সতর্কতা

অনলাইন বা অফলাইন, যেখানেই পড়েন না কেন, উস্তায নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু অনলাইনের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব তুলনামূলক বেশি। কেননা অনলাইনে উস্তায সরাসরি সামনে থাকেন না। ফলে এক্ষেত্রে ধোঁকা খাওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি থাকে। 

সালাফে সালেহীনের থেকে একটি উপদেশ পাওয়া যায়-এই ইলম দ্বীনের অংশ। সুতরাং কার থেকে ইলম নিচ্ছেন, তা খেয়াল করবেন।[1] সুতরাং যার কাছ থেকে ইলম নিতে চাচ্ছেন, তার বিষয়ে আগে ভাল করে জেনে নিবেন। তিনি কোথায় পড়াশুনা করেছেন, কাদের কাছে পড়েছেন ইত্যাদি। যার কোনো উস্তায নেই, নিজে নিজে বইপত্র পড়ে ইলম অর্জন করেছে, তার থেকে ইলম গ্রহণ না করা উচিত। কারণ উস্তায ছাড়া এভাবে ইলম শিখলে তাতে অনেক ভুল-ভ্রান্তি ও অসঙ্গতি থাকে। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস খতীব বাগদাদী রাহ. বলেন, ‘ইলম অন্বেষণকারী দ্বীনের বুঝ ও সমঝ গ্রহণ করবে আলেমদের যবান থেকে; শুধু বই-পুস্তক থেকে নয়।’[2]

একটি ভুল পন্থা

অনলাইনে যারা পড়াশুনা করে তাদের অনেকে একটি ভুল পদ্ধতি অবলম্বন করে। যার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল লাভে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। তা হলো, একসাথে একাধিক কোর্সে অংশগ্রহণ করা। এতে করে কোনটাই ভাল মত শেখা হয় না। সেজন্য উচিত হলো, একটা একটা করে সামনে আগানো। মনে রাখবেন, ইলমের পথ হলো ধীরেসুস্থে চলার পথ। যদি তাড়াহুড়া করা হয়, তাহলে অল্পতে ক্লান্তি ও বিরক্তি ভর করার দরুন সেই পথ পাড়ি দেওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। 

আদবের প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা

যারা অনলাইনে পড়াশুনা করে, তাদের ব্যাপারে অনেক সময় আদবের কমতির অভিযোগ শোনা যায়। এদিকটাতেও লক্ষ্য রাখা উচিত। মনে রাখতে হবে, সালাফগণ ইলম শেখার আগে আদব শেখার কথা বলেছেন। ইলমের পরিমাণের চেয়ে আদবের পরিমাণ বেশি হবার প্রতি গুরুত্ব প্রদান করেছেন। বিখ্যাত ইমাম মালিক ইবনু আনাস রহ. কুরাইশ বংশধর জনৈক যুবককে বলেছেন, ‘ইলম শিখার আগে আদব বা শিষ্টাচার শিখো।’[3]

প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারাক রহ. বলেছেন, ‘হাদীসের কিতাব অধ্যয়নের চেয়ে আদব অর্জনের প্রয়োজন বেশি।’[4]

সালাফের যামানায় বহু তালিবুল ইলম দারসে অংশ নিতেন শুধু আদব-কায়দা সম্পর্কে অবগত হবার জন্য। প্রখ্যাত আলেম ইসমাইল ইবনু উলাইয়্যাহ রহ. বলেছেন, ‘ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল রহ. এর দারসে অসংখ্য ছাত্র উপস্থিত হতো। তাদের মধ্যে পাঁচশো ছাত্র হাদীস লেখত আর অবশিষ্ট ছাত্ররা তাঁর থেকে আদব বা শিষ্টাচার শিখত।’[5]

একটি শঙ্কা ও তার প্রতিকার

অনলাইনে যারা কোন প্রতিষ্ঠানে নিয়মতান্ত্রিক পড়াশোনা করেন, তারা প্রায় সবাই জেনারেল শিক্ষিত। এক্ষেত্রে একটা আশঙ্কা থাকে যে, তারা অল্প কিছু পড়েই নিজেদের আলেম মনে করে ফেলেন কিনা! বা শরীয়াহর বিভিন্ন বিষয়ে ভুল-ভাল ব্যাখ্যা করা শুরু করেন কিনা! তো এই বিষয়টি উস্তাযদের সচেতনার মাধ্যমে প্রতিহত করা সম্ভব। শিক্ষার্থীদের মগজে বারবার বলার মাধ্যমে এই বিষয়টা গেঁথে দিতে হবে যে, তারা কেবলই প্রাথমিক পর্যায়ের একজন শিক্ষার্থী। উলুমে শরীয়াহর গভীর জ্ঞান অর্জন দূর কি বাত, তারা এখনো এর গভীরতা অবলোকের ধারেকাছেও যেতে পারেনি। সুতরাং একটু পড়েই যেন নিজেকে ‘মুই কিছু হনু রে’ মনে করে না ফেলে। এটা শুধু অনলাইনে না; বরং অফলাইনে যারা ব্যক্তিগতভাবে কোন শিক্ষকের কাছে বা কোন মাদরাসায় পড়ছে সবার জন্যই সমান জরুরি। কারণ এই আশঙ্কা সকলের থেকেই সমানভাবে থাকে।

শিক্ষার্থীদের জন্য এক্ষেত্রে সংক্ষেপে কয়েকটি কথা জরুরী মনে করছি। তা হলো, ফতোয়া প্রদান করা বা দ্বীনী মাসআলাগত বিষয়ে কথা বলা খুবই গুরুতর কাজ। কেননা ভুল হলে এর পুরো দায় সেই ব্যক্তিকেই বহন করতে হবে। হাদীসে এসেছে, যদি কেউ না জেনে আন্দাযি ফতোয়া দেয় তাহলে এর কারণে যে গুনাহ হবে তা ফতোয়াদাতার উপর বর্তাবে।[6]

তাছাড়া কুরআনেও বলা হয়েছে, ‘যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তার পিছনে পড়ো না। নিশ্চয় কান, চক্ষু ও অন্তঃকরণ এদের প্রত্যেকটিই জিজ্ঞাসিত হবে।’[7] এসব কারণে সালাফে সালেহীন ফতোয়া প্রদানের ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকতেন। সম্ভব হলে নিজে তা এড়িয়ে গিয়ে অন্যকে দেখিয়ে দিতেন।

তাবিয়ী ইবনে লায়লা রহ. বলেন, আমি ১২০ জন আনসারী সাহাবীদের সাক্ষাত লাভ করেছি, তাঁদের কারও নিকট যখন মাসআলা পেশ করা হত, তখন তিনি আরেকজনের কাছে সেটা পাঠাতেন। অতঃপর তিনি আরেকজনকে জিজ্ঞেস করতে বলতেন, এভাবে অবশেষে প্রথমে যার নিকট প্রশ্ন করা হয়েছিল, তার নিকট ফিরে আসত।[8]

বিখ্যাত মুজতাহিদ ফকীহ সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষের সকল প্রশ্নের উত্তর দেয় এবং সকল বিষয়ে ফতোয়া প্রদান করে সে অবশ্যই পাগল।’ এমন বক্তব্য অন্য আরেকজন বিশিষ্ট ফকীহ সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকেও বর্ণিত আছে।[9]

তবে এর মানে এই না যে, তারা প্রয়োজনের সময়ও মাসআলা জানা থাকলে তা বলতেন না। হযরত সুফয়ান সাওরী রহ. বলেন, ‘আমি এমন ফকীহদেরকে পেয়েছি, যারা মাসআলা ও ফতোয়া প্রদান করতে অপছন্দ করতেন। নিতান্ত নিরূপায় হলে তারা ফতোয়া প্রদান করতেন। ফতোয়ার ক্ষেত্রে সর্বাধিক জ্ঞাত সেই ব্যক্তি, যে চুপ থাকে, আর এক্ষেত্রে যে অধিক কথা বলে, সে হল চরম মূর্খ।’[10]

মূলত মানুষের ইলম যখন কম থাকে, তখন সে ফতোয়া প্রদানের প্রতি খুব আগ্রহবোধ করে। ইলম যত বারতে থাকে, এই প্রবণতা কমতে থাকে। কেননা তখন এর গুরুতরতা তার বুঝে আসে। ইবনুল কাইয়্যিম রাহ. বলেছেন, ‘ফতোয়া প্রদান করতে উদ্যত হওয়াটা কম ইলমের কারণেও হতে পারে আবার অধিক ইলমের কারণেও হতে পারে। অতএব যখন কারও ইলম কম থাকে, তখন তাকে যে বিষয়েই প্রশ্ন করা হয়, না জেনে সে সকল বিষয়ে সমাধান দেয়।’[11]

তিনি আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষকে ফতোয়া দেয়ার যোগ্য না হয়েও ফতোয়া প্রদান করল, সে গোনাহগার ও আল্লাহর অবাধ্য।’[12]

সুতরাং অনলাইনে কিছু দিন পড়ার পরই ফতোয়া দেওয়ার মত বিপদসঙ্কুল পথে না নামা। এটা বিশেষভাবে খেয়াল রাখা উচিত।


[1] এটি বিখ্যাত তাবেয়ী ইবনে সীরিন রাহ.সহ আরো অনেকের থেকে বর্ণিত হয়েছে।

[2] আলফাকীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ : ২/১৯৩

[3] হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৬/৩৩০

[4] আল-জামি লি আখলাকির রাওয়ী : ১/৮০

[5] সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১১/৩১৬

[6] আবু দাউদ: ৩৬৫৭

[7] সুরা ইসরা : ৩৬

[8] ইলামুল মুয়াক্কিয়ীন, ইবনুল কাইয়িম : ৪/১৬৮

[9] [9] ইলামুল মুয়াক্কিয়ীন, ইবনুল কাইয়িম : ১/২৮

[10] আল-আদাবুশ শরইয়্যাহ, আল্লামা ইবনে মুফলিহ : ২/৬৬

[11] ইলামুল মুয়াক্কিয়ীন, ইবনুল কাইয়িম : ১/২৮

[12] ইলামুল মুয়াক্কিয়ীন, ইবনুল কাইয়িম : ৪/১৬৬

Share:

Facebook
Twitter
Pinterest
LinkedIn

জনপ্রিয় ব্লগ

বাংলা

হিফজ শিক্ষার্থীর বাবা-মায়ের জন্য ৮ পরামর্শ

অনেক বাবা-মায়ের স্বপ্ন থাকে ছেলেকে হাফেজ বানাবেন। নিজেরা আল্লাহর কালামকে পরিপূর্ণ বুকে ধারণ না করতে পারার আফসোস কিছুটা হলেও ঘোচানোর

পুরোটা পড়ুন
বাংলা

তাবলিগ জামাত : একটি নির্মোহ পর্যবেক্ষণ

ব্যক্তিগতভাবে আমি তাবলীগী জামাতের সাথে জড়িত কেউ না। তবে খুব কাছ থেকে তাদেরকে দেখার সুযোগ হয়েছে। ছাত্র জীবনে কয়েকবার ছাত্র-জামাতেও

পুরোটা পড়ুন